
ভূমিকা
সিগারেট হাতে নিয়ে অনেকের মনে একটাই প্রশ্ন আসে — “সিগারেট খাওয়া কি হারাম?”
এই প্রশ্নটা শুধু কৌতূহলের নয়। অনেক মুসলিম সত্যিই জানতে চান — ইসলাম এই বিষয়ে কী বলে, কোরআন বা হাদিসে কিছু আছে কিনা, এবং আলেমরা কী মত দিয়েছেন।
সত্যি কথা হলো — কোরআনে বা হাদিসে “সিগারেট” শব্দটি সরাসরি নেই। কারণ সিগারেটের প্রচলন অনেক পরে হয়েছে। কিন্তু ইসলামের মূলনীতি এবং শরীরের ক্ষতি সম্পর্কিত বিধানের আলোকে আলেমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট মত দিয়েছেন।
এই আর্টিকেলে কোরআন ও হাদিসের দলিল, চার মাযহাবের অবস্থান এবং সমসাময়িক আলেমদের ফতোয়ার আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করা হবে।
এই আর্টিকেলে যা যা আছে ( এক নজরে )
সিগারেট খাওয়া কি হারাম নাকি মাকরুহ?
এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন — কারণ আলেমদের মধ্যে দুটো মত আছে। তবে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ আলেম একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে এসেছেন।
হারাম বলার কারণ
অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম সিগারেট খাওয়াকে হারাম বলেছেন। তাঁদের মূল যুক্তি তিনটি —
প্রথমত, ইসলামে নিজের শরীরের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। সিগারেট যে শরীরের ক্ষতি করে — এটি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। ফুসফুস ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক — এগুলো ধূমপানের সরাসরি পরিণতি।
দ্বিতীয়ত, পরোক্ষ ধূমপানে পাশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হন। ইসলামে অন্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ।
তৃতীয়ত, সিগারেটে অর্থের অপচয় হয় — যা ইসলামে অপছন্দনীয়।

মাকরুহ বলার পুরনো মত
কিছু পুরনো আলেম সিগারেটকে মাকরুহ তাহরিমি বলেছেন — অর্থাৎ হারামের কাছাকাছি কিন্তু সম্পূর্ণ হারাম নয়।
এই মতের কারণ ছিল — সে সময় সিগারেটের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ প্রমাণিত ছিল না। তখনকার প্রেক্ষাপটে এই মতটি দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে অধিকাংশ আলেমের অবস্থান
আজকের দিনে বিষয়টি আর বিতর্কিত নয়।
সিগারেটের ক্ষতি বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ প্রমাণিত হওয়ার পর বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো — যেমন দারুল ইফতা মিসর, রাবেতাতুল আলামিল ইসলামি এবং আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি — সিগারেটকে হারাম ঘোষণা করেছে।
সহজ কথায় —
সিগারেট খাওয়া ইসলামে হারাম। মাকরুহের পুরনো মতটি বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে আর প্রযোজ্য নয়।
আরও পড়ুন পান খাওয়া কি হারাম
কোরআন ও হাদিসে ধূমপান সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
কোরআন বা হাদিসে “সিগারেট” শব্দ সরাসরি নেই — এটা সত্য। কিন্তু ইসলামের যে মূলনীতিগুলো আছে, সেগুলো দিয়েই আলেমরা ধূমপানের বিধান নির্ধারণ করেছেন।
কোরআনের দলিল
শরীরের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ:
আল্লাহ তায়ালা বলেন —
“তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ২:১৯৫)
এই আয়াত সরাসরি প্রমাণ করে — নিজের শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করা ইসলামে নিষিদ্ধ। সিগারেট ঠিক এই কাজটিই করে।
অপচয় নিষিদ্ধ:
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন —
“তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আনআম: ৬:১৪১)
প্রতিদিন সিগারেটে যে অর্থ ব্যয় হয় — সেটি স্পষ্ট অপচয়।
হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন —
“নিজের ক্ষতি করো না এবং অন্যের ক্ষতি করো না।” (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
এই হাদিসটি ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত। সিগারেট নিজের ক্ষতি করে — এবং পাশের মানুষেরও ক্ষতি করে। তাই এই হাদিসের আলোকে ধূমপান সরাসরি নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন —
“তোমার শরীরের উপর তোমার অধিকার আছে।” (সহিহ বুখারি: ১৯৭৫)
অর্থাৎ শরীরকে সুস্থ রাখা ইসলামে দায়িত্ব — ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করা নয়।
ইসলামে ক্ষতিকর কাজ কেন নিষিদ্ধ?

ইসলামের পাঁচটি মূল সংরক্ষণীয় বিষয় আছে —
জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ, বংশ ও ধর্ম।
ধূমপান এই পাঁচটির মধ্যে অন্তত তিনটিকে সরাসরি ক্ষতি করে — জীবন, বুদ্ধি ও সম্পদ। তাই ইসলামের মূলনীতির আলোকে সিগারেট হারাম হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত।
চার মাযহাবের আলেমদের দৃষ্টিতে ধূমপানের বিধান
সিগারেটের প্রচলন শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে — চার মাযহাবের ইমামদের অনেক পরে। তাই তাঁরা সরাসরি এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে পরবর্তী প্রজন্মের ফকিহরা প্রতিটি মাযহাবের মূলনীতির আলোকে ধূমপানের বিধান নির্ধারণ করেছেন।
হানাফি মাযহাব
হানাফি মাযহাবের প্রথম দিকের কিছু আলেম সিগারেটকে মাকরুহ বলেছিলেন। তবে পরবর্তীতে এই মাযহাবের শীর্ষ আলেমরা হারামের দিকে মত দিয়েছেন।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো — যা শরীরের স্পষ্ট ক্ষতি করে এবং অর্থের অপচয় ঘটায়, তা নিষিদ্ধ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সিগারেটের ক্ষতি প্রমাণ করার পর হানাফি আলেমদের অধিকাংশই ধূমপানকে হারাম বলছেন।
শাফেয়ি মাযহাব
শাফেয়ি মাযহাবে শরীরের ক্ষতিকর যেকোনো বিষয় নিষিদ্ধ — এই মূলনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট।
মিসরের বিখ্যাত শাফেয়ি আলেম শায়খ আলী জুমআ (সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, মিসর) সিগারেটকে হারাম বলেছেন। তাঁর যুক্তি — সিগারেট শরীরের যে ক্ষতি করে তা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, তাই এটি ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।
মালেকি মাযহাব
মালেকি মাযহাবেও ক্ষতিকর বস্তু ব্যবহার নিষিদ্ধ। মালেকি ফকিহরা সিগারেটকে হারাম বলেছেন কারণ এটি —
- শরীরের ক্ষতি করে
- অর্থের অপচয় ঘটায়
- পাশের মানুষকে কষ্ট দেয়
মরক্কো ও উত্তর আফ্রিকার মালেকি আলেমরা এ বিষয়ে একমত।
হাম্বলি মাযহাব
হাম্বলি মাযহাবে সিগারেটের বিধান নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ফতোয়া এসেছে।
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) — যিনি হাম্বলি মাযহাবের অন্যতম শীর্ষ আলেম ছিলেন — স্পষ্টভাবে বলেছেন ধূমপান হারাম। তাঁর যুক্তি ছিল —
ধূমপান শরীরের ক্ষতি করে, অর্থের অপচয় ঘটায় এবং অন্যকে কষ্ট দেয় — এই তিনটি কারণেই এটি হারাম।
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ) — যেটি হাম্বলি মাযহাবের উপর প্রতিষ্ঠিত — ধূমপানকে হারাম ঘোষণা করেছে।
চার মাযহাবের অবস্থান এক নজরে
| মাযহাব | বর্তমান অবস্থান | মূল যুক্তি |
|---|---|---|
| হানাফি | হারাম | শরীরের ক্ষতি ও অপচয় |
| শাফেয়ি | হারাম | ক্ষতিকর বস্তু নিষিদ্ধ |
| মালেকি | হারাম | নিজের ও অন্যের ক্ষতি |
| হাম্বলি | হারাম | তিনটি কারণে নিষিদ্ধ |
চার মাযহাবের বর্তমান অবস্থান একটি জায়গায় মিলে গেছে —
সিগারেট খাওয়া হারাম।
সমসাময়িক আলেমদের ফতোয়া
চার মাযহাবের মূলনীতির পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও আলেমরা সরাসরি ধূমপানের বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছেন। এগুলো সবই একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে এসেছে।
দারুল ইফতা মিসরের সিদ্ধান্ত
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বিশ্বস্ত ফতোয়া প্রতিষ্ঠান দারুল ইফতা মিসর স্পষ্টভাবে ধূমপানকে হারাম ঘোষণা করেছে।
তাদের ফতোয়ায় বলা হয়েছে — ধূমপান শরীরের ক্ষতি করে, অর্থের অপচয় ঘটায় এবং পাশের মানুষকে কষ্ট দেয়। ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী এই তিনটি কারণেই এটি হারাম।
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.)
সৌদি আরবের বিখ্যাত আলেম শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.) ধূমপান সম্পর্কে বলেছেন —
“ধূমপান হারাম। কারণ এতে শরীরের ক্ষতি হয়, সম্পদের অপচয় হয় এবং ধূমপায়ীর কাছে থাকা মানুষগুলো কষ্ট পায়।”
তিনি আরও বলেন — যে ব্যক্তি ধূমপান ছাড়তে পারছেন না, তার উচিত আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং ধীরে ধীরে এই অভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টা করা।
আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি
OIC-এর অধীনে গঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি ১৯৯০ সালে একটি প্রস্তাব পাস করে। সেখানে ধূমপানকে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে — কারণ এটি শরীরের ক্ষতি করে এবং ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ ও ভারতের আলেমদের অবস্থান
বাংলাদেশ ও ভারতের অধিকাংশ আলেম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন। এই অঞ্চলের শীর্ষ আলেমরাও ধূমপানকে হারাম বা কমপক্ষে মাকরুহ তাহরিমি বলেছেন।
দেওবন্দ মাদরাসার ফতোয়া বিভাগ থেকেও ধূমপানকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে — শরীরের ক্ষতি ও অপচয়ের যুক্তিতে।
সংক্ষেপে
বিশ্বের প্রধান ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও আলেমদের অবস্থান এক জায়গায় মিলে গেছে —
ধূমপান হারাম — এ বিষয়ে আর কোনো দ্বিমত নেই।
সিগারেট খেলে কি অযু ভেঙে যায়?
এই প্রশ্নটি অনেকেই করেন — বিশেষত যারা নামাজের আগে সিগারেট খান।
সরাসরি উত্তর হলো — না, সিগারেট খেলে অযু ভাঙে না।
ইসলামে অযু ভাঙার নির্দিষ্ট কারণ আছে — যেমন পেশাব, পায়খানা, বায়ু নির্গমন, গভীর ঘুম বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। সিগারেট খাওয়া এই তালিকায় নেই।
তাই ফিকহের দৃষ্টিতে সিগারেট খেলে অযু ভাঙে না — এ বিষয়ে চার মাযহাবেই একমত।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
সিগারেট যদিও অযু ভাঙে না — তবু এটি হারাম। অযু না ভাঙলেই কোনো কিছু জায়েজ হয়ে যায় না। সিগারেট হারাম থাকে তার নিজস্ব কারণে — শরীরের ক্ষতি ও অপচয়ের কারণে।
সিগারেট খেয়ে নামাজ পড়া যাবে কি?
এই প্রশ্নটির দুটো দিক আছে — একটি ফিকহি, আরেকটি নৈতিক।
অযুর বিষয়
আগের সেকশনে বলা হয়েছে — সিগারেট খেলে অযু ভাঙে না। তাই অযুর দিক থেকে সিগারেট খেয়ে নামাজ পড়া যাবে।
তবে এর মানে এই নয় যে সিগারেট খাওয়া জায়েজ হয়ে গেল। নামাজ পড়া যাওয়া আর সিগারেট হালাল হওয়া — এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সিগারেটের গন্ধ ও মুসল্লিদের কষ্ট
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুন খেয়ে মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন — কারণ এর গন্ধে অন্য মুসল্লিরা কষ্ট পান।
“যে ব্যক্তি পেঁয়াজ বা রসুন খেয়েছে, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে।” (সহিহ মুসলিম: ৫৬৪)
সিগারেটের গন্ধ পেঁয়াজ-রসুনের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ও কষ্টদায়ক। তাই সিগারেট খেয়ে সরাসরি মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়া — এটি অন্য মুসল্লিদের জন্য কষ্টের কারণ হয়।
ইসলামে অন্যকে কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ। তাই সিগারেট খেলে মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করে এবং গন্ধ দূর করে মসজিদে যাওয়া উচিত।
সংক্ষেপে
সিগারেট খেয়ে নামাজ পড়া যাবে — তবে দুটো শর্তে:
- মুখের গন্ধ পরিষ্কার করে নিন
- মনে রাখবেন সিগারেট হারাম — নামাজ পড়তে পারা মানে সিগারেট জায়েজ নয়
সিগারেট, হুক্কা ও ই-সিগারেটের বিধান কি একই?
অনেকে মনে করেন — সিগারেট হারাম হলেও হুক্কা বা ই-সিগারেট হয়তো জায়েজ। এই ধারণাটি সঠিক নয়।
হুক্কার বিধান
হুক্কা দেখতে আলাদা হলেও এতে তামাকই ব্যবহার হয়। পানির মধ্য দিয়ে ধোঁয়া টানা হয় বলে অনেকে মনে করেন এটি কম ক্ষতিকর।
কিন্তু WHO-এর গবেষণা বলছে — একটি হুক্কা সেশনে একজন মানুষ একটি সিগারেটের চেয়ে অনেক বেশি ধোঁয়া গ্রহণ করেন। তাই স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিক থেকে হুক্কা সিগারেটের চেয়ে কম নয়, বরং বেশি হতে পারে।
ইসলামি বিধানের দিক থেকে হুক্কার বিধান সিগারেটের মতোই — হারাম।
ই-সিগারেটের বিধান
ই-সিগারেট বা ভেপ নিয়ে অনেকে ভাবেন — এতে তামাক নেই, তাই হয়তো জায়েজ।
কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়।
ই-সিগারেটে নিকোটিন থাকে — যা আসক্তি তৈরি করে এবং শরীরের ক্ষতি করে। এছাড়া এতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলোও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
যেহেতু ই-সিগারেট শরীরের ক্ষতি করে এবং আসক্তি তৈরি করে — তাই ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী এটিও নিষিদ্ধ। অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম ই-সিগারেটকেও হারাম বা মাকরুহ তাহরিমি বলেছেন।
এক নজরে তুলনা
| প্রকার | মূল উপাদান | স্বাস্থ্যগত ক্ষতি | ইসলামি বিধান |
|---|---|---|---|
| সিগারেট | তামাক ও নিকোটিন | মারাত্মক | হারাম |
| হুক্কা | তামাক ও নিকোটিন | সিগারেটের চেয়ে বেশি | হারাম |
| ই-সিগারেট | নিকোটিন ও রাসায়নিক | ক্ষতিকর | হারাম/মাকরুহ |
| পরোক্ষ ধূমপান | অন্যের ধোঁয়া | প্রমাণিত ক্ষতি | হারাম |
সহজ কথা: ধূমপানের যেকোনো ধরন — সিগারেট, হুক্কা বা ই-সিগারেট — যদি শরীরের ক্ষতি করে, তাহলে ইসলামে তা নিষিদ্ধ।
ধূমপান ছাড়ার ইসলামিক পদ্ধতি
ধূমপান হারাম জানার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে — ছাড়বো কীভাবে?
ইসলাম শুধু নিষেধ করে না — পথও দেখায়।
তওবা ও দৃঢ় সংকল্প
ধূমপান ছাড়ার প্রথম ধাপ হলো আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং মনে মনে দৃঢ় সংকল্প নেওয়া।
আল্লাহ তায়ালা বলেন —
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারা: ২:২২২)
তওবার অর্থ শুধু অনুশোচনা নয় — ফিরে না আসার সংকল্পও।
দোয়া করুন
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন —
“যে ব্যক্তি সংযমী হতে চায়, আল্লাহ তাকে সংযমী করে দেন।” (সহিহ বুখারি: ১৪৬৯)
ধূমপান ছাড়ার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া — এটি দুর্বলতা নয়, বরং ঈমানের প্রকাশ।
ধীরে ধীরে ছাড়ুন
হঠাৎ করে ছেড়ে দেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিমাণ কমানো এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে এগোনো বেশি কার্যকর।
ইসলামে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের নজির আছে — মদ নিষিদ্ধ হয়েছিল ধাপে ধাপে।
বিস্তারিত জানতে
ধূমপান ছাড়ার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, ঘরোয়া উপায় এবং বিকল্প অভ্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের আলাদা আর্টিকেল পড়ুন:
👉 [ধূমপান ছাড়ার সহজ উপায় — বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও বাস্তব করণীয়]
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সিগারেট খাওয়া কি হারাম নাকি মাকরুহ?
বর্তমানে অধিকাংশ আলেম ও বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলো সিগারেটকে হারাম বলেছেন। পুরনো কিছু আলেম মাকরুহ বলেছিলেন — তবে সেটি ছিল সিগারেটের ক্ষতি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগের মত। এখন সিগারেটের ক্ষতি শতভাগ প্রমাণিত — তাই হারামই প্রযোজ্য।
সিগারেট খেলে কি অযু ভাঙে?
না। সিগারেট খেলে অযু ভাঙে না। তবে সিগারেট হারাম — অযু না ভাঙলেই কোনো কিছু জায়েজ হয়ে যায় না।
সিগারেট খেয়ে নামাজ পড়া যাবে?
হ্যাঁ, পড়া যাবে — কারণ সিগারেটে অযু ভাঙে না। তবে মুখের গন্ধ পরিষ্কার করে মসজিদে যাওয়া উচিত। কারণ তীব্র গন্ধে অন্য মুসল্লিরা কষ্ট পান — যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
টয়লেটে বসে সিগারেট খেলে কি হয়?
ইসলামে টয়লেট অপবিত্র স্থান। সেখানে বসে সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যগত ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই অনুচিত। সিগারেটের ধোঁয়া ও টয়লেটের দুর্গন্ধ মিলে বাতাস আরও দূষিত হয় এবং শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি বাড়ে।
খালি পেটে সিগারেট খেলে কি হয়?
খালি পেটে সিগারেট খাওয়া শরীরের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। পাকস্থলীতে অ্যাসিড বাড়ে, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় এবং রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে যায়। ইসলামে শরীরের অতিরিক্ত ক্ষতি করা নিষিদ্ধ — তাই এটি আরও বেশি অনুচিত।
ই-সিগারেট কি হারাম?
হ্যাঁ। ই-সিগারেটে নিকোটিন ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। শরীরের ক্ষতি করে বলে অধিকাংশ আলেম এটিকেও হারাম বা মাকরুহ তাহরিমি বলেছেন।
উপসংহার
সিগারেট খাওয়া কি হারাম — এই প্রশ্নের উত্তর এখন পরিষ্কার।
কোরআন ও হাদিসের মূলনীতি, চার মাযহাবের আলেমদের মত এবং বিশ্বের শীর্ষ ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া — সবকিছু একটাই কথা বলছে।
সিগারেট খাওয়া হারাম।
শরীরের ক্ষতি করা, অর্থের অপচয় এবং পাশের মানুষকে কষ্ট দেওয়া — এই তিনটি কারণেই ইসলাম ধূমপানকে নিষিদ্ধ করে।
অনেকে জানেন এটি হারাম — তারপরও ছাড়তে পারছেন না। এটা দুর্বলতা নয়, নিকোটিনের আসক্তি একটি বাস্তব সমস্যা। তবে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, দৃঢ় সংকল্প করা এবং ধীরে ধীরে এগোনো — এই পথেই সমাধান সম্ভব।
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন।”
(সূরা তালাক: ৬৫:২)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার এবং সুস্থ জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

