
ভূমিকা
সৌদি আরবে কাজের সুবাদে মরুভূমিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল কয়েকবার। একদিন কফিলের ভাই একটি অদ্ভুত প্রাণী ধরে নিয়ে এলেন — গায়ে খসখসে আঁশ, লেজটা মোটা ও শক্ত, দেখতে অনেকটা গুইসাপের মতো। জিজ্ঞেস করলাম — এটা কী?
উত্তর এলো — “দব্ব।” বাংলায় যাকে অনেকে সান্ডা বলেন।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই মাথায় প্রশ্ন এলো — সান্ডা খাওয়া কি হালাল? রাসূলুল্লাহ (সা.) কি এটি খেয়েছিলেন? ইসলামে এর বিধানটা আসলে কী?
এই প্রশ্নগুলো শুধু আমার একার নয়। বাংলাদেশি প্রবাসী থেকে শুরু করে দেশে থাকা অনেকেই এই বিষয়ে জানতে চান। এই আর্টিকেলে সহিহ হাদিস, চার মাযহাবের বিধান এবং সৌদি আরবের বাস্তব প্রচলনের আলোকে বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হবে।
এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে ( এক নজরে )
সান্ডা বা দব কী? ইসলামে এর পরিচয়
বাংলাদেশে “সান্ডা” বলতে অনেকে গুইসাপ বা অন্য কোনো সরীসৃপ বোঝেন। কিন্তু ইসলামি হাদিসে যে প্রাণীর কথা এসেছে — সেটি সম্পূর্ণ আলাদা।
সান্ডার বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য
হাদিসে বর্ণিত প্রাণীটির আরবি নাম “দব্ব” (ضب)। বৈজ্ঞানিক নাম Uromastyx, ইংরেজিতে বলা হয় Spiny-tailed Lizard।
প্রাণীটির কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে যা একে অন্য সরীসৃপ থেকে আলাদা করে —
- শরীর চওড়া ও মাঝারি আকারের, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ৬০-৮৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে
- লেজটি মোটা, খসখসে এবং কাঁটার মতো আঁশে ঢাকা — যা দেখতে যতটা ভয়ঙ্কর মনে হয়, প্রাণীটি ততটা বিপজ্জনক নয়
- সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী — মরুভূমির ঘাস, লতাপাতা ও শস্য খেয়ে বাঁচে
- বিষাক্ত নয় এবং মানুষকে আক্রমণ করে না
সৌদি আরবে কাজের সময় নিজে এই প্রাণী ধরতে গিয়ে দেখেছি — লেজ দিয়ে জোরে আঘাত করে, কিন্তু কামড় দেয় না। লেজের স্পর্শটা বেশ তীক্ষ্ণ মনে হয় — তবে ক্ষতি করে না।
সান্ডা কোথায় পাওয়া যায়?
দব্ব মূলত আরব উপদ্বীপের মরুভূমি অঞ্চলের প্রাণী — সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, জর্দান ও মিসরের শুষ্ক এলাকায় এদের দেখা মেলে। বালুময় মরুভূমিতে গর্ত করে বাস করে এবং দিনের বেলা সক্রিয় থাকে।
বাংলাদেশে এই প্রজাতির সান্ডা পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে “সান্ডা” নামে যে প্রাণী পরিচিত — সেটি মূলত গুইসাপ বা অন্য প্রজাতির সরীসৃপ। হাদিসে বর্ণিত দব্ব এবং বাংলাদেশের স্থানীয় “সান্ডা” — এই দুটি এক প্রাণী নয়।
এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি। কারণ হাদিসের বিধান দব্বের জন্য — বাংলাদেশের যেকোনো সরীসৃপের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।
👉আরও পড়ুন শাপলাপাতা মাছ খাওয়া কি হালাল?
👉আরও পড়ুন পান খাওয়া কি হালাল
সৌদি আরবে সান্ডা — একজন প্রবাসীর চোখে
মরুভূমিতে সান্ডা শিকারের দৃশ্য কেমন?
সৌদি আরবে প্রায় আট বছর কাজ করার সুবাদে কফিলের পরিবারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার মরুভূমিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে দেখেছি — কফিলের ভাই ও তার বন্ধুরা খোলা মরুভূমিতে সান্ডা খুঁজে বের করেন, গর্ত থেকে ধরে আনেন।
প্রাণীটা ধরতে গেলে লেজ দিয়ে জোরে আঘাত করে। লেজটা এতটাই শক্ত ও খসখসে যে প্রথমবার ধরতে গিয়ে বেশ নার্ভাস লেগেছিল। তবে কামড় দেয় না — এটা নিশ্চিত করেই বলেছিলেন কফিলের ভাই।
সৌদি আরবে সান্ডা খাওয়ার প্রচলন কতটা?
সব সৌদি পরিবারে এই প্রাণীটি খাওয়ার চল নেই। ব্যক্তি ও পরিবারভেদে পার্থক্য আছে।
যতটুকু দেখেছি — পুরুষরা তুলনামূলক বেশি আগ্রহী। মহিলারাও খান, তবে অনেক কম। কফিলের পরিবারে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম — ঘরের ভেতরে এটি রান্না করতে দিতেন না মহিলারা। বাইরে খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রান্না হতো।
এটি কেবল খাবারের বিষয় নয় — সৌদি সংস্কৃতিতে মরুভূমিতে একসঙ্গে শিকার করে বাইরে রান্না খাওয়াটা একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো। বন্ধুরা মিলে যান, শিকার করেন, রান্না করেন এবং একসঙ্গে খান — পুরো বিষয়টায় একটা উৎসবের আমেজ থাকে।
স্বাদ কেমন — একটি সৎ অভিজ্ঞতা
বারবার চাপ দেওয়ায় একবার অল্প একটু খেয়েছিলাম। স্বাদটা মন্দ ছিল না — অনেকটা শক্ত মাছের মাংসের মতো। হাড়গুলো মুরগির মতো নরম নয়, বরং বড় মাছের কাঁটার মতো। পূর্ণবয়স্ক সান্ডায় বেশ চর্বি থাকে।
কফিলের ভাই বলতেন এটি খেলে শরীরে শক্তি আসে — বিশেষত পুরুষদের জন্য উপকারী বলে তারা বিশ্বাস করেন। এটি তাদের প্রচলিত ধারণা — বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাস হিসেবে।
সান্ডা খাওয়া কি হালাল? হাদিসে কী বলা হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সরাসরি হাদিসের দিকে তাকাতে হবে। কারণ কোরআনে দব্বের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি — তবে হাদিসে বেশ কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত আছে যা থেকে বিধান পরিষ্কার হয়।
أُهْدِيَ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ ضَبٌّ، فَلَمْ يَأْكُلْهُ، وَلَا نَهَى عَنْهُ
অনুবাদ: হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একবার এক লোক সাণ্ডা হাদিয়া দেয়। তিনি তা খাননি, কিন্তু এটিকে হারামও ঘোষণা করেননি।”
سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنِ الضَّبِّ، فَقَالَ: لَا آكُلُهُ، وَلَسْتُ أُحَرِّمُهُ
অনুবাদ: হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সাণ্ডা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “আমি এটি খাই না, তবে এটিকে হারামও বলি না।”
أُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِضَبٍّ مَشْوِيٍّ، فَوُضِعَ بَيْنَ يَدَيْهِ، فَأَهْوَى إِلَيْهِ يَدَهُ، فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ النِّسَاءِ: أَخْبِرُوا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ بِمَا يُرِيدُ أَنْ يَأْكُلَ، فَقَالُوا: هُوَ ضَبٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَرَفَعَ يَدَهُ، فَقَالَ: أَكْرَهُهُ، وَلَيْسَ بِحَرَامٍ
অনুবাদ: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দস্তরখানায় সাণ্ডা পরিবেশিত হয়েছিল। তিনি ঘৃণার কারণে তা খাননি, কিন্তু এটিকে হারামও বলেননি। সাহাবীরা তা খেয়েছিলেন।
একটি বাক্যই বিধানের মূল ভিত্তি। নবীজি (সা.) নিজে খাননি — কারণ তাঁর জন্মভূমিতে এই প্রাণী প্রচলিত ছিল না, তাই স্বভাবগত অপছন্দ ছিল। কিন্তু “অপছন্দ” আর “হারাম” — এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
হাদিস থেকে কী বোঝা যায়?
তিনটি বিষয় এখানে স্পষ্ট —
প্রথমত, রাসূলুল্লাহ (সা.) দব্বকে হারাম ঘোষণা করেননি। ইসলামে কোনো কিছু হারাম হতে হলে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা লাগে — এখানে তা নেই।
দ্বিতীয়ত, সাহাবিরা নবীজির সামনেই দব্ব খেয়েছেন এবং তিনি নিষেধ করেননি। ইসলামি ফিকহে এই ধরনের নীরব সম্মতিকে “তাকরির” বলা হয় — যা একটি শক্তিশালী দলিল।
তৃতীয়ত, নবীজির নিজে না খাওয়াটা ব্যক্তিগত রুচির বিষয় ছিল — ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নয়। এই পার্থক্যটা না বুঝলে অনেকে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
সহজ কথায় —
দব্ব বা সান্ডা খাওয়া ইসলামে হারাম নয়। হাদিসের দলিল এটিকে বৈধ প্রমাণ করে।
👉আরও পড়ুন ধুমপান কি যায়েজ
চার মাযহাবে সান্ডা খাওয়ার বিধান
হাদিসের দলিল স্পষ্ট হলেও চার মাযহাবের ইমামগণ এই প্রাণীর বিধান নির্ধারণে কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। এটি ইসলামের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য — কোনো মতই ভুল নয়।
এক নজরে চার মাযহাবের অবস্থান:
| মাযহাব | বিধান | মূল কারণ |
|---|---|---|
| হানাফি | মাকরুহ তাহরিমি | সরীসৃপ জাতীয় ও ঘৃণিত প্রাণী হিসেবে বিবেচিত |
| শাফেয়ি | হালাল | নবীজি হারাম বলেননি, সাহাবিরা সামনে খেয়েছেন |
| মালেকি | হালাল | হাদিসের স্পষ্ট অনুমতির ভিত্তিতে |
| হাম্বলি | হালাল | নিরামিষভোজী ও পবিত্র প্রাণী হিসেবে বৈধ |
হানাফি মাযহাবে সান্ডার বিধান
হানাফি মাযহাবে দব্ব খাওয়া মাকরুহ তাহরিমি — অর্থাৎ হারামের কাছাকাছি, তবে সম্পূর্ণ হারাম নয়।
এই মতের পেছনে মূল যুক্তি হলো — হানাফি ফিকহে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী এবং যেসব প্রাণী দেখতে ঘৃণ্য মনে হয়, সেগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা আছে। দব্ব সরীসৃপ হওয়ায় এই শ্রেণিতে পড়ে।
বাংলাদেশ ও ভারতের অধিকাংশ মুসলিম হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন। তাই তাদের জন্য এটি না খাওয়াই উত্তম।
শাফেয়ি মাযহাবে সান্ডার বিধান
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে দব্ব খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল। তাঁর যুক্তি সরাসরি হাদিসনির্ভর — রাসূলুল্লাহ (সা.) এটি হারাম বলেননি এবং সাহাবিরা তাঁর সামনে খেয়েছেন।
শাফেয়ি মাযহাব মূলত মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিসরে বহুল প্রচলিত। সৌদি আরবে দব্ব অবাধে খাওয়া হয় — এর পেছনে এই মাযহাবের প্রভাবও একটি কারণ।
মালেকি মাযহাবে সান্ডার বিধান
মালেকি মাযহাবেও দব্ব হালাল। ইমাম মালিক (রহ.) হাদিসের দলিলকে প্রাধান্য দিয়েছেন — যেখানে নবীজির নীরব সম্মতি এবং সাহাবিদের আচরণ স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
হাম্বলি মাযহাবে সান্ডার বিধান
হাম্বলি মাযহাবেও এটি হালাল। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) এই বিষয়ে স্পষ্ট মত দিয়েছেন — দব্ব নিরামিষভোজী, বিষাক্ত নয় এবং হাদিসে নিষিদ্ধ নয়। তাই এটি খাওয়া বৈধ।
সৌদি আরবে হাম্বলি মাযহাবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই কারণেই সেখানে দব্ব খাওয়া সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি খাবার।
সান্ডা ও গুইসাপ কি একই প্রাণী?

অনেকেই এই দুটি প্রাণীকে এক মনে করেন — কারণ দেখতে কিছুটা মিল আছে। কিন্তু বাসস্থান, খাদ্যাভ্যাস এবং ইসলামি বিধানের দিক থেকে এরা সম্পূর্ণ আলাদা।
নামের মিল থাকলেও পার্থক্য কোথায়?
বাংলাদেশে “সান্ডা” বলতে সাধারণত গুইসাপকেই বোঝানো হয়। কিন্তু হাদিসে বর্ণিত দব্ব (ضب) এবং বাংলাদেশের গুইসাপ (Monitor Lizard) — এই দুটি প্রাণী বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির।
সান্ডা বনাম গুইসাপ — তুলনামূলক পার্থক্য
| বিষয় | সান্ডা/দব্ব (Uromastyx) | গুইসাপ (Monitor Lizard) |
|---|---|---|
| বৈজ্ঞানিক পরিবার | Agamidae | Varanidae |
| আবাসস্থল | মরুভূমি | নদী, খাল, জঙ্গল |
| খাদ্যাভ্যাস | নিরামিষভোজী | মাংসাশী, মৃত প্রাণী খায় |
| লেজের বৈশিষ্ট্য | মোটা, খসখসে, কাঁটাযুক্ত | লম্বা, মসৃণ |
| আকার | মাঝারি, ৬০-৮৫ সেমি | বড়, ১-২ মিটার পর্যন্ত |
| বিষাক্ততা | বিষাক্ত নয় | বিষাক্ত নয়, তবে আক্রমণাত্মক |
| ইসলামি বিধান | হালাল (অধিকাংশ মাযহাবে) | হারাম |
গুইসাপ কি হালাল?
না — গুইসাপ খাওয়া ইসলামে হারাম।
কারণ দুটি স্পষ্ট। প্রথমত, গুইসাপ মাংসাশী প্রাণী — মৃত জীব, ব্যাঙ, পোকামাকড় এবং ছোট প্রাণী খায়। ইসলামে মাংসাশী প্রাণী খাওয়া নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, নাপাক বস্তু খাওয়ার কারণে ফিকহিবিদগণ একে হারাম বলেছেন।
বাংলাদেশের গ্রামে ছোটবেলা থেকে গুইসাপ দেখা যায় — খালে, নদীতে, জঙ্গলে। এটি মুরগির বাচ্চা ধরে, ব্যাঙ খায়, মৃত প্রাণীও খায়। এই খাদ্যাভ্যাসের কারণেই ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অগ্রহণযোগ্য।
সান্ডার স্বাদ কেমন? পুষ্টিগুণ ও প্রচলিত ধারণা
সান্ডার মাংসের স্বাদ ও গঠন কেমন?
সৌদি আরবে থাকাকালীন একবার খেয়েছিলাম — বারবার চাপ দেওয়ার পরে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, স্বাদটা আশ্চর্যজনকভাবে মন্দ ছিল না।
মাংসের গঠন অনেকটা শক্ত সামুদ্রিক মাছের মতো — না মুরগির মতো নরম, না গরুর মতো চিবানো কঠিন। হাড়গুলো বড় মাছের কাঁটার মতো — সহজেই আলাদা করা যায়। পূর্ণবয়স্ক সান্ডায় বেশ চর্বি থাকে, যা রান্নার সময় বের হয়ে আসে।
সৌদিরা সাধারণত এটি আগুনে ভেজে বা গ্রিল করে খান — কোনো বিশেষ মশলা ছাড়াই স্বাদ ভালো লাগে বলে তাদের দাবি।
সান্ডা খেলে কি সত্যিই শক্তি বাড়ে?
কফিলের ভাই এবং আশপাশের সৌদিরা প্রায়ই বলতেন — সান্ডা খেলে শরীরে পাওয়ার আসে, বিশেষত পুরুষদের জন্য উপকারী। এটি তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাস।
তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। তাই এটিকে প্রমাণিত স্বাস্থ্যগুণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
সান্ডার মাংসে কী ধরনের পুষ্টি থাকতে পারে?
সান্ডা নিরামিষভোজী প্রাণী — ঘাস, লতাপাতা ও শস্য খেয়ে বাঁচে। এই খাদ্যাভ্যাসের কারণে এর মাংসে উচ্চমাত্রার প্রোটিন এবং তুলনামূলক কম চর্বি থাকার সম্ভাবনা আছে — ঠিক যেভাবে তৃণভোজী প্রাণীর মাংসে সাধারণত দেখা যায়।
তবে সান্ডার মাংসের নির্দিষ্ট পুষ্টিমান নিয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো সীমিত। এই বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করার মতো উপাত্ত হাতে নেই।
সান্ডা তেল: কী, কোথায় ব্যবহার হয় এবং কী জানা জরুরি?
সান্ডা তেলের প্রচলিত ব্যবহার
সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে সান্ডার তেল দীর্ঘদিন ধরে লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের মধ্যে বিশ্বাস আছে যে এই তেল —
- গেঁটেবাত ও জয়েন্টের ব্যথায় উপকারী
- চুলের বৃদ্ধি ও ত্বকের সমস্যায় কার্যকর
- পুরুষদের যৌনশক্তি বাড়ায়
বাংলাদেশেও অনলাইনে বা আরবি পণ্যের দোকানে এই তেল বিক্রি হতে দেখা যায়। দাম তুলনামূলক বেশি এবং বিক্রেতারা নানা স্বাস্থ্যগুণের দাবি করেন।
সান্ডা তেলের উপকারিতা: প্রমাণ কী বলে?
সরাসরি বলা দরকার — সান্ডা তেলের এই দাবিগুলোর পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। প্রচলিত বিশ্বাস আর প্রমাণিত চিকিৎসাগুণ — এই দুটি আলাদা বিষয়।
বাজারে যে সান্ডা তেল পাওয়া যায় তার অনেকগুলোই ভেজাল বা অন্য উপাদান মিশিয়ে তৈরি। আসল সান্ডার তেল কিনা — তা নিশ্চিত করার কোনো সহজ উপায় সাধারণ ক্রেতার হাতে নেই।
ব্যবহার করার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত
- বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ সান্ডা তেলের উৎস ও বিশুদ্ধতা অজানা
- ত্বকে সরাসরি ব্যবহারের আগে অ্যালার্জি পরীক্ষা করা উচিত
- স্বাস্থ্যগত সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে শুধু এই তেলের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়
- অতিরিক্ত দাম দিয়ে অপ্রমাণিত পণ্য কেনার আগে সতর্ক থাকুন
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে — সান্ডা হালাল প্রাণী হওয়ায় এর তেল ব্যবহারেও কোনো বাধা নেই। তবে ভেজাল পণ্য থেকে সাবধান থাকা এবং বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।
সান্ডা খাওয়া নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
সান্ডা খাওয়া কি ইসলামে জায়েজ?
হ্যাঁ — অধিকাংশ মাযহাবে জায়েজ। শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাযহাবে সান্ডা বা দব্ব খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল। হানাফি মাযহাবে এটি মাকরুহ তাহরিমি — হারাম নয়, তবে না খাওয়াই উত্তম। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম হানাফি, তাদের জন্য এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
দব বলতে কোন প্রাণীকে বোঝানো হয়?
দব্ব (ضب) হলো আরব উপদ্বীপের মরুভূমিতে বসবাসকারী একটি নিরামিষভোজী সরীসৃপ — বৈজ্ঞানিক নাম Uromastyx। এটি বাংলাদেশের গুইসাপ বা অন্য কোনো সরীসৃপ নয়। হাদিসে এই প্রাণীর কথাই বলা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কি সান্ডা বা দব খেয়েছিলেন?
না — তিনি নিজে খাননি। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এই প্রাণী তাঁর জন্মভূমিতে পাওয়া যেত না, তাই স্বভাবগতভাবে অপছন্দ ছিল। তবে তিনি এটি হারামও বলেননি এবং সাহাবিরা তাঁর সামনে খেয়েছেন — তিনি বাধা দেননি।
সান্ডা ও গুইসাপ কি একই প্রাণী?
না, সম্পূর্ণ আলাদা। সান্ডা বা দব্ব মরুভূমির নিরামিষভোজী প্রাণী — গুইসাপ নদী ও জঙ্গলের মাংসাশী প্রাণী। দুটির বৈজ্ঞানিক পরিবার, খাদ্যাভ্যাস ও ইসলামি বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিস্তারিত তুলনা আগের সেকশনে দেওয়া আছে।
হানাফি মাযহাবে দব্ব খাওয়ার বিধান কী?
হানাফি মাযহাবে দব্ব মাকরুহ তাহরিমি। এর মানে — খেলে কবিরা গুনাহ হবে না, কিন্তু বিরত থাকাই উত্তম। হানাফি ফিকহে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী সাধারণত এই শ্রেণিতে পড়ে।
সান্ডা তেল ব্যবহার করা কি জায়েজ?
সান্ডা হালাল প্রাণী হওয়ায় এর তেল ব্যবহারে ইসলামে কোনো বাধা নেই। তবে বাজারে বিক্রি হওয়া সান্ডা তেলের বিশুদ্ধতা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি — অনেক পণ্যে ভেজাল থাকে।
উপসংহার
সান্ডা বা দব্ব খাওয়া নিয়ে যে বিভ্রান্তি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে — এই আর্টিকেলে সেটি পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মূল উত্তরটা সহজ —
রাসূলুল্লাহ (সা.) দব্বকে হারাম বলেননি। সাহাবিরা তাঁর সামনে খেয়েছেন। শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাযহাবে এটি সম্পূর্ণ হালাল। হানাফি মাযহাবে মাকরুহ — হারাম নয়।
তাই মাযহাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন। হানাফি হলে না খাওয়াই নিরাপদ। অন্য মাযহাব হলে খেতে বাধা নেই।
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি — বাংলাদেশে “সান্ডা” বলতে যে গুইসাপ বোঝানো হয়, সেটি হাদিসের দব্ব নয়। গুইসাপ মাংসাশী, নাপাক বস্তু খায় — তাই সেটি হারাম। দুটিকে এক করে বিধান প্রয়োগ করলে ভুল হবে।
সৌদি আরবে আট বছর থেকে নিজের চোখে দেখেছি — এই দেশে দব্ব খাওয়া একটি স্বাভাবিক ও সাংস্কৃতিক খাবার। ইসলামি রাষ্ট্রে এটি যদি হারাম হতো, বাজারে বিক্রি হতো না।
যদি এখনো সন্দেহ থাকে, নিজের স্থানীয় আলেমের কাছে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বুঝিয়ে ফতোয়া নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

