
আমাদের সমাজে রমজান মাস এলেই রীতি রেওয়াজের নামে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়— ‘মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইফতারি পাঠানো’। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সামাজিকতা বা সংস্কৃতি মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ অনৈসলামিক রীতি বা কুপ্রথা, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র বাবার কষ্টের কারণ। আজ সময় এসেছে এই তথাকথিত ‘সংস্কৃতি’র আড়ালে লুকিয়ে থাকা সামাজিক ব্যাধি নিয়ে কথা বলার।
ইফতারি দেওয়া কি সুন্নাত নাকি কু-প্রথা ?
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কাউকে ইফতার খাওয়ানো বা খাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে তা হতে হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ এবং আন্তরিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“কোনো মুসলমানের সম্পদ তার আন্তরিক সম্মতি ব্যতীত হস্তগত করলে তা হালাল হবে না।” বায়হাকি, হাদিস ১৬৭৫৬
যখন কোনো বাবা লোকলজ্জার ভয়ে, সামাজিক চাপে পড়ে বা মেয়ের ওপর মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে ইফতারি পাঠান, তখন সেই খাবার গ্রহণ করা আর জুলুম করা একই কথা। এটি তখন আর সুন্নাত থাকে না, বরং তা পরোক্ষভাবে ‘হারাম’ বা ‘জুলুমের’ পর্যায়ে চলে যায়।
আরো পড়ুন, বর্তমান যুগের কুসংস্কার কী কী ********
আপনার সাজানো ইফতারির থালার আড়ালে হয়তো কোনো মধ্যবিত্ত বাবার দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে।
ইফতারি: যৌতুকের এক আধুনিক রূপ
বিয়ের সময় আসবাবপত্র বা নগদ টাকা নেওয়াকে আমরা যৌতুক হিসেবে চিনি। কিন্তু বিয়ের পর প্রতি বছর সৃজনভিত্তিক ফলের মৌসুমে ফল আর রমজান মাসে কয়েক মণ জিলাপি, মিষ্টি আর মৌসুমি ফল পাঠানোর এই বাধ্যবাধকতা আসলে ‘ডিজিটাল যৌতুক’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
- সামাজিক প্রতিযোগিতা: কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বেশি ফল বা ইফতার এলো—তা নিয়ে সমাজে যে দম্ভ বা অহংকার ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে, তা দরিদ্র বাবাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ঋণ গ্রস্থ হয়ে পড়েন এমনকি সুদে টাকা এনে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি পাঠাতে হয় যা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- মানসিক নির্যাতন: ইফতারি কম হলে বা দিতে দেরি হলে মেয়ের ওপর চলে কটু কথা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর পরিবারের কটু কথা ও মানসিক নির্যাতনের ফলে দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ বা আত্মহত্যার মতো করুণ পরিণতিও ডেকে আনে।
উপহার যখন স্বেচ্ছায় না হয়ে সামাজিক চাপে বা বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, তখন সেটি আর ভালোবাসা থাকে না; বরং তা একটি নীরব নির্যাতনে রূপ নেয়।
আইনের চোখে যৌতুক ও ইফতারি প্রথা
বাংলাদেশের যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ অনুযায়ী, বিবাহের শর্ত হিসেবে বা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেকোনো সম্পদ দাবি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের ৩ ও ৪ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে:
“যদি বিবাহের কোনো এক পক্ষ অন্য পক্ষের নিকট কোনো যৌতুক দাবি করেন, তবে তিনি অনধিক ৫ বছর এবং অন্যূন ১ বছর কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।”
অনেক সময় ছেলেপক্ষ বলে, “আমরা তো চাইনি, তারা খুশি হয়ে দিচ্ছে।” কিন্তু মনে রাখতে হবে, উপহার যদি চাপের মুখে বা প্রথার দায়ে দিতে হয়, তবে তা আর উপহার থাকে না। এটি এক প্রকার সামাজিক ‘ঘুষ’ যা মেয়ের নিরাপত্তার জন্য বাবা দিতে বাধ্য হন।
আমি এমনও লোক দেখেছি নিজেকে ভালো মানুষ সাজাতে এরকম বলে যে , না আমাদের ইফতারি লাগবে না । আমাদের যতেষ্ট টাকা পয়সা আছে ইফতারি কিনে খাওয়ার জন্য , অথচ এই একই লোকের পরিবারে, যখন মেয়ের বাবা পরবর্তিতে মেয়ের খুশির কথা চিন্তা করে । ইফতারি নিয়ে যায় । তখন এই পরিবারের লোকজনই খোটা দেয় রমজান মাসের প্রথম তারিখে কেনো নিয়ে আসে নি । পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়ে আসেনি আত্নীসজন পাড়াপ্রতিবেশি সবাইকে ভালো করে খাওয়াতে পারেনি । মিষ্টি জিলাপির কোয়ালিটি ভালো ছিলো না ইত্যাদি।

আরও পড়ুন , বেশি বয়সে বিয়ে করলে কী কী ক্ষতি
কেন এই কুপ্রথা বন্ধ করা জরুরি?
- ১. দরিদ্র বাবার চোখের জল: আপনার বাড়ির ইফতারি যখন উৎসবের আমেজ তৈরি করে, তখন হয়তো মেয়ের বাবা সেই টাকা জোগাড় করতে সুদে ঋণ নিয়ে নিভৃতে কাঁদছেন। শুধু মাত্র দরিদ্র বাবার মেয়েকে যাতে স্বামীর পরিবারের লোকদের থেকে কটু কথা শুনতে না হয়।
- ২. হীন মানসিকতার বিস্তার: হাদিসে এসেছে, “দাতার হাত গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” (বুখারি)। কিন্তু এই প্রথায় ছেলের বাড়ির লোকজন যেন ভিক্ষুকের মতো মেয়ের বাবার পকেটের দিকে তাকিয়ে থাকে।
- ৩. অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া: আপনি বিত্তবান বলে জাঁকজমক করে ইফতারি পাঠাচ্ছেন, কিন্তু আপনার এই কাজ দেখে পাশের বাড়ির গরিব মেয়েটিকে তার শ্বশুরবাড়ি লোকজন খোটা দিচ্ছে। আপনার “খুশি” অন্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর আপনি ইচ্ছে করে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি দিচ্ছেন , অর্থাৎ আপনার মাধ্যমে সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কু-প্রথা পালনে লোক উৎসাহিত হচ্ছে । আর গরিবদের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দারিয়েছে ।
আমাদের করণীয়: ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনই
এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে:
- ছেলের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যান: ছেলের মা-বাবা এবং ছেলেকে সরাসরি বলতে হবে, “আমরা ইফতারি চাই না, আমাদের সামর্থ্য আছে কিনে খাওয়ার।”
- অহংকার বর্জন: কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কী এলো, তা নিয়ে গল্প বা প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। মেয়েকে ইফতারির জন্য আশপাশের পাড়া প্রতিবেশি, পরিবারের কেউ যেনো ইফতারির জন্য খোটা না দেয়।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: জুম্মার খুতবায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে । এবং কারো শ্বশুর বাড়ি থেকে ইফতারি দিলে প্রতিবেশি বা আত্নীয় হিসেবে ইফতারির দাওয়াত দিলে যাওয়া যাবে না , খাওয়া যাবে না স্পষ্ট বলতে হবে এটা কু -প্রথা এবং হালাল নয় ।
ইফতারি কোনো ইবাদত নয়, বরং এটি একটি আধুনিক সামাজিক ব্যাধি। আসুন রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এই কালচারকে ‘না’ বলি।
উপসংহার
বিষের বোতলে মধুর লেবেল লাগালেই তা মধু হয়ে যায় না। তেমনি ইফতারির নামে এই জোরপূর্বক উপঢৌকন বা ইফতারি কখনোই সংস্কৃতি হতে পারে না। এটি একটি সামাজিক অভিশাপ কু-প্রথা । আসুন, এই রমজান মাসে আমরা শপথ করি—আমরা ইফতারি নামক এই নোংরা প্রথাকে ‘না’ বলব এবং আমাদের সমাজকে একটি সুন্দর ও মানবিক বাসযোগ্য স্থানে পরিণত করব।
আপনার এলাকায় কি শ্বশুরবাড়ির ইফতারির নামক এই কু-প্রথাটি এখনো চালু আছে? এটি বন্ধে আপনার পরামর্শ কী? আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান এবং পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করুন।
আরও পড়ুন , সান্ডা বা দ্বব খাওয়া কি হালাল ?


